পন্ডিত সুজিত গঙ্গোপাধ্যায় | Pandit Sujit Gangpadhyay

বিষ্ণুপুর ঘরাণার পন্ডিত সুজিত গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে সাক্ষাতকার

in Interview
Published on: 17 June 2019

শর্মিষ্ঠা চক্রবর্তী (Sharmishtha Chakraborty)

শর্মিষ্ঠা চক্রবর্তী ‘এঞ্জিনিয়ারিং ও সেরামিক প্রযুক্তির শিক্ষাবিষয়ক’ সরকারী কলেজ থেকে বি-টেক ডিগ্রি প্রাপ্ত। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জন করেছেন। তিনি কগনিজেন্ট টেকনোলজি সোলিউশান সংস্থায় তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসাবে কর্মরত। তিনি একজন ফ্রিলান্স লেখক। স্পর্হা(দেশ ২০১৫ কবিতা) এবং না পৌঁছানো মানুষ (দেশ ২০১৬ ছোট গল্প) সমেত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা ও ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছে। শর্মিষ্ঠা ভারতীয় ও বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহী।

বিষ্ণুপুর ঘরাণার বিভিন্ন অভিমুখ, অতীত ও বর্তমানকালের নিরিখে আলোচিত হয়েছে নিম্নলিখিত এই সাক্ষাতকার জুড়ে।

প্রসঙ্গ:

বিষ্ণুপুর ঘরাণার বৈশিষ্ট্য ও গায়নশৈলী সম্পর্কে সুচিন্তিত ও মূল্যবান মতামত রেখেছেন পন্ডিত সুজিত গঙ্গোপাধ্যায়।একজন বিষ্ণুপুর ঘরাণার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী ও বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষ্ণুপুর ঘরাণা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে আলোকপাত করেছেন তিনি।

 

পন্ডিত সুজিত গঙ্গোপাধ্যায়

পন্ডিত সুজিত গঙ্গোপাধ্যায়  (কার্টিসি: শর্মিষ্ঠা চক্রবর্তী )  

 

পন্ডিত সুজিত গঙ্গোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয়: 

বিষ্ণুপুর ঘরাণার সুগায়ক পন্ডিত সুজিত গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের জন্ম ১৯৫৩ সালের ৪ঠা মার্চপ্রথম গুরু পিতা পন্ডিত অমরনাথ গঙ্গোপাধ্যায় পিতার কাছেই বিষ্ণুপুর ঘরাণায় তাঁর হাতেখড়ি ঘটে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। তারপর সঙ্গীতশিক্ষা করেন বিষ্ণুপুর ঘরাণার দিকপাল শিল্পী পন্ডিত অমিয় রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পন্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর কাছেসঙ্গীত বিশারদ, সঙ্গীত তীর্থ প্রভৃতি উপাধি এবং সোপান সন্মান, যদুভট্ট পুরস্কার, সুরসাগর সন্মান প্রভৃতি অর্জন তিনি করেন।

পন্ডিত সুজিত গঙ্গোপাধ্যায়, বিষ্ণুপুরের রামশরণ সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের বর্তমান আচার্য। ১৯৭৮ সাল থেকে তিনি এই পদের গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিষ্ণুপুরে অনুষ্ঠিত বাৎসরিক চব্বিশ ঘন্টা ব্যাপী, নিরবিচ্ছিন্ন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান – ‘সুরযজ্ঞে’র উদ্যোগী আহ্বায়ক তিনি

বিষয়:

বিষ্ণুপুর ঘরাণার সেকাল ও একাল

 

শর্মিষ্ঠা চক্রবর্তী: বিষ্ণুপুর ঘরানার অরিজিন বা সূচনা সম্পর্কে অনেকগুলি মতামত আছে। কোন মতটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে আপনার মনে হয়?

পন্ডিত সুজিত গঙ্গোপাধ্যায়: কথিত আছে যে, বিষ্ণুপুর ঘরানার একদম শুরুতে আছেন তান সেনের বংশধর বাহাদুর খাঁ আর মৃদঙ্গবাদক পীরবক্স প্রচলিত মতানুসারে, বাহাদুর খাঁর কাছে রামশঙ্কর ভট্টাচার্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা করেন। কিন্তু আবার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে যে বাহাদূর খাঁর আসার সময়কাল আর রামশঙ্কর ভট্টাচার্যের জীবনকালের মধ্যে প্রায় দুই প্রজন্মের ব্যবধান। অর্থাৎ তাঁরা সমসাময়িক নন।

বাহাদুর খাঁ বলে নিশ্চয় কেউ ছিলেন। কারণ, বাহাদুর খাঁ সাহেবের লেখা, মল্লরাজ দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের প্রশস্তিমূলক একটি ধ্রুপদ পাওয়া যায়। বাহাদুরগঞ্জ বলে যে জায়গাটি বিষ্ণুপুরে রয়েছে, কেউ কেউ তার উল্লেখও করেন। হতে পারে, যে সেনী বংশের না হলেও অন্য কোনো বাহাদুর খাঁ হয়তো ছিলেন।

সবথেকে প্রতিষ্ঠিত মত হলো, মথুরা বৃন্দাবন অঞ্চলের কোনো পন্ডিতজী পুরীধাম যাবার পথে বালক রামশঙ্করকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনান ও আগ্রহী করে তোলেন। ফেরার পথে বিষ্ণুপুরের রাজার কাছে বছরদুই থেকে রামশঙ্করকে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম দেন। এই পন্ডিতজী থেকেই বিষ্ণুপুর ঘরানার সূচনা।তবে, কিছু কিছু ইতিহাস অতিরঞ্জিত বলে মনে হয়। যেমন, পুরীধাম যাবার আগে, বিষ্ণুপুররাজের দরবারে পন্ডিতজীর গাওয়া ধ্রুপদ একবার শুনেই, হুবহু শিখে নেন বালক রামশঙ্কর। ফেরার পথে দরবারে, সেই গান শুনে মুগ্ধ পন্ডিতজী রামশঙ্করকে শিষ্য হিসেবে গ্রহন করেনএখানে মনে রাখতে হবে বালকটি, এর আগে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সংস্পর্শে আসেনি। ধ্রুপদের গায়নশৈলী ক্লাসিক। সে তো আর তিন মিনিটের আধুনিক গান নয় যে কোনোরকম তালিম ছাড়াই একবার শুনেই শিখে ফেলা যাবে!

এ বিষয়ে সঙ্গীতাচার্য সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতটিই সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য – তাঁর মতে, রামশঙ্কর ভট্টাচার্য পশ্চিম থেকে আগত এক হিন্দুস্হানি ধ্রুপদ গায়কের কাছে, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষা করেন, ও তারপর তাঁর সাথে চলে যান। অনেকদিন সেখানে থেকে  ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পার শিক্ষা সম্পূর্ণ করে ফিরে আসেন এবং আজীবনের সাধনা, চেষ্টা ও নিষ্ঠায় একটি ঘরানার ভিত স্হাপন করেন।

 

শ.চ.: সেনী ঘরানার সাথে বিষ্ণুপুর ঘরাণার সম্পর্ক নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক সে বিষয়ে আপনি যদি কিছু বলেন –

প. সু.গ.: তানসেনের গওহর বানীর ধ্রুপদের স্টাইলের সাথে বিষ্ণুপুর ঘরাণার ধ্রুপদের স্টাইলের তত বেশী সামঞ্জস্য আমি অন্তত পাই না। তানসেন রচিত অনেক ধ্রুপদ বিষ্ণুপুর ঘরাণায় গাওয়া হয়। কিন্তু সে তো ভারতবর্ষের সর্বত্রই গাওয়া হয়!
মথুরা-বৃন্দাবনের ধ্রুপদ বাংলার কথকতা, কীর্ত্তণের আবহাওয়ায় এসে বিষ্ণুপুর ঘরাণার রূপ নেয়। আমাদের বিষ্ণুপুর ঘরাণায় অনেক রাগের চলনে, যে স্বতন্ত্র রূপ আমরা দেখি, তার সর্বভারতীয় স্বীকৃতি তো দেখি না। তাহলে সেনী ঘরাণা হলে ভারতবর্ষের সর্বত্রই তো সেনী ঘরাণার রূপ একই হওয়া উচিত!

 

শ.চ.: বিষ্ণুপুর ঘরাণার ধ্রুপদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যদি একটু বলেন –

প. সু.গ.: ধ্রুপদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সুরের মাধ্যমে ঈশ্বরসাধনা। পরবর্তীকালে তা উপাসনাগৃহ থেকে এসে পৌঁছলো রাজার দরবারে। শিল্পীদের মধ্যে তখন প্রতিযোগীতা, প্রতিদ্বন্দ্বীতা বাড়ল। উপাসনালয়ে ছিল ভক্তি। দরবারে যখন এল তখন তার সাথে এল ওস্তাদি। কে রাজার বেশী প্রিয় হতে পারে তাই নিয়ে চলল রেষারেষি।

কিন্তু আমাদের বিষ্ণুপুর ঘরাণার বৈশিষ্ট্য হলো, এখানের রাজার দরবার থাকলেও রাজারা বংশানুক্রমে ছিলেন ভক্ত বৈ‍ষ্ণব এবং মন্দির অন্ত প্রাণ। তাঁরা অজস্র মন্দির তৈরী করেছিলেন আর এইসব মন্দিরে ঈশ্বরের আরাধনার জন্য গান গাওয়ার রেওয়াজ ছিল।

আমার মনে হয়, ধ্রুপদের একেবারে গোড়ার উদ্দেশ্য ঈশ্বরসাধনা, একমাত্র বিষ্ণুপুরেই সার্থকভাবে সাধিত হয়েছিল। এখনও বিষ্ণুপুরের ঘরাণার ধ্রুপদে সেই মূল উদ্দেশ্যই রক্ষিত হচ্ছে। আমাদের ঘরাণায় ভক্তিভাবেরই প্রাবল্য বোলবাঁট করা হয় কিন্তু ওস্তাদি, আনুপাতিক ভাবে কম। সেজন্য কিছুটা নিরলঙ্কার। এটা আমাদের ইচ্ছাকৃত। বিষ্ণুপুর ঘরাণার ধ্রুপদে প্রথমে আলাপের মাধ্যমে রাগের ধ্যানরূপ ফুটিয়ে তোলা হয়। তারপর পাখোয়াজের সঙ্গতে চারতুকের ধ্রুপদ গাওয়া হয়। ঔদ্ধত্ব না দেখিয়ে, ভক্তি ও শ্রদ্ধার ভাব রেখে, ঈশ্বর আরাধনা করাই এ ঘরাণার বৈশিষ্ট্য।

 

শ.চ.: বিষ্ণুপুর ঘরাণার কোনো ছাপ কি যন্ত্রসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে পড়েছিল বলে মনে হয়?

প. সু.গ.: বিষ্ণুপুর ঘরাণায় ধ্রুপদ ও খেয়াল দুইএরই চল ছিল। ধ্রুপদের সাথে পাখোয়াজের সঙ্গত ছিল আবশ্যিক। একদিকে বীণা, সুরবাহার যেমন ছিল ধ্রুপদাঙ্গের যন্ত্র, তেমনি সেতার, এস্রাজ এগুলো ছিলো খেয়ালঙ্গের।

আচার্য রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় যন্ত্রসঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ধ্রুপদাঙ্গের ও খেয়ালঙ্গের যন্ত্রসঙ্গীত দুইএরই চর্চা করতেন। বিষ্ণুপুর ঘরাণার যে রাগের চলন, তার গায়কীর যে স্টাইল, সেটাকে অনুসরণ করেই এখানে যন্ত্রসঙ্গীতের চর্চা হয়েছেতবে এমন নয় যে সেটা কোনো স্বতন্ত্র একটা ধ‌ারা তৈরী করেছিল।

শুরুর দিকে, মৃদঙ্গবাদক পীরবক্স ছাড়া আর কারো নাম সেভাবে পাওয়া যায় না। পীরবক্স সম্বন্ধেও ঐ একটু আধটু নাম ছাড়া আর কিছু জানা যায় না। তারপর আসেন বেচারাম চট্টোপাধ্যায়(পাখোয়াজ), রামমোহন চক্রবর্তী(পাখোয়াজ), গোকুল নাগ (সেতার), নৃত্যানন্দ গোস্বামী (পাখোয়াজ), অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায় (সেতার, সুরবাহার, এস্রাজ), সুবোধ নন্দী (পাখোয়াজ), মণিলাল নাগ (সেতার) প্রমূখ পাখোয়াজ বাদ্যে আরও যারা সুনাম অর্জন করেছিলেন তাদের মধ্যে জগৎচাঁদ গোস্বামী,কীর্তিচন্দ্র গোস্বামী,জগন্নাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

চর্চা ছিল জলতরঙ্গ, ন্যাসতরঙ্গের। বিষ্ণুপুরে রামশরণ মিউজিক কলেজে নৌতরঙ্গ বলে একটা যন্ত্র আছে। এ যন্ত্র আমি আর কোথাও দেখিনি। আমার কাছে এ যন্ত্র স্বতন্ত্র, অভিনব এবং অনেকটাই অপ্রচলিত।

 

শ.চ.: একসময় বাংলায় এবং ভারতবর্ষে ধ্রুপদের প্রবল সমাদর ছিল। ধ্রুপদের সেই পপুলারিটি আজ নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছে। খেয়ালের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি কি এর একটা কারণ?

প.সু.গ.: আমার মনে হয় ধ্রুপদের কিছু কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। সেই প্রতিবন্ধকতাগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আরও চিন্তা করা দরকার। আরও বেশী করে কি করে মানুষের কাছে আকর্ষনীয় হয়, কি ভাবে মানুষ গ্রহণ করে সে বিষয়েও চিন্তা করা দরকার। পরিবর্তনশীলতা যদি জীবনের ধর্ম হয় তবে ধ্রুপদেও পরিবর্তন আনা দরকার। কিন্তু ধ্রুপদে পরিবর্তন আনার পক্ষে খুব কম লোক। যার জন্য সেটা এক জায়গায় রয়ে গেছে।

একটা সময় ধ্রুপদ ছিল। তার আগে তো ছিল না! ধ্রুপদের থেকেই খেয়ালের সৃষ্টি। খেয়াল মানুষকে বেশী করে আকর্ষন করল। সেটা খেয়ালের পোটেনশিয়ালিটি। মানুষের চাহিদা এই পরিবর্তন এনেছে।

বেশীরভাগ ক্লাসিক্যাল প্রোগ্রামেই এখন একাধিক খেয়াল গায়ক থাকেন। কিন্তু ধ্রুপদ গায়কের উপস্হিতি নগন্য। এটা শুধু পশ্চিমব্ঙ্গের নয় গোটা ভারতবর্ষের ছবি। ধ্রুপদ গায়ক নেই, কেন? নিশ্চয় বেশীরভাগ মানুষ ধ্রুপদ অত বেশী পছন্দ করছেন না! আমি নিজে ধ্রুপদ, খেয়াল দুইএরই চর্চা করি। আমি মনে করি, যারা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ছাত্র, তাদের দুটোই খুব ভালো করে শেখা দরকার। ধ্রুপদ ও খেয়াল একে অপরের পরিপূরক।

 

শ.চ.: বাংলা ধ্রুপদ ও বাংলা খেয়াল এ ব্যাপারে যদি কিছু বলেন –

প.সু.গ.: বাংলা ধ্রুপদ ও বাংলা খেয়াল এ দুইএরই জন্মস্হান বিষ্ণুপুর। বাংলা ধ্রুপদ ও বাংলা খেয়াল উভয়কেই প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। রামশঙ্কর ভট্টাচার্য, সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এঁনারা চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা বাংলা ধ্রুপদ ও বাংলা খেয়ালকে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে অপদস্হও হয়েছিলেন। কিন্তু কোনোভাবেই তাঁরা স্বীকৃতি পান নি।

আমার মতে পাওয়া উচিতও নয়। কারণ ধ্রুপদ, খেয়াল এগুলো সর্বভারতীয় সঙ্গীত। কোনো আঞ্চলিক ব্যাপার নয়। তাই আমার মতে, বাংলা ধ্রুপদ বা বাংলা খেয়াল বলে আলাদা কিছু না হওয়াই উচিত। বাংলার আঞ্চলিক গান – যেমন বাউল, কীর্ত্তণ, শ্যামা সঙ্গীত, সেসব তো রয়েছে!

ধ্রুপদ বা খেয়ালের আদলে বাংলা কথার গান গাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু সেটাকে বাংলা ধ্রুপদ বা বাংলা খেয়াল হিসাবে না দেখে, ধ্রুপদাঙ্গের বা খেয়ালঙ্গের বাংলা গান বলাই বোধহয় যুক্তিযুক্ত হবে।

 

শ.চ.: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের ক্ষেত্রে বিষ্ণুপুর ঘরাণা কতটা প্রভাব রেখেছে?

প.সু.গ.: রাধিকা প্রসাদ গোস্বামীর ধ্রুপদ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, সেই সুরে রবীন্দ্রনাথ অনেক গান রচনা করেছেনবাঙালী পেয়েছে ধ্রুপদাঙ্গের রবীন্দ্র সঙ্গীত। যদুভট্টের গঙ্গাবন্দনার ধ্রুপদ – ‘জয় প্রবল বেগবতী সুরেশ্বরী’ থেকে তিনি করেছেন – ‘জয় তব বিচিত্র আনন্দ হে’যদুভট্ট করেছেন গঙ্গাবন্দনা আর উনি করেছেন পরমের বন্দনা। সুর তো হুবহু এক। আর কথার ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ অনেক জায়গায় যদুভট্টের রচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

 

শ.চ.: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিষ্ণুপুর ঘরাণার ধ্রুপদ শেখার উৎসাহ কতটা?

প.সু.গ.: আমাদের বিষ্ণুপুর ঘরাণা অখন্ড বাংলার একমাত্র ঘরাণা। এর নিজেরই ভৌগলিক পরিধি অনেকটা। পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাত্রছাত্রীরা, বিষ্ণুপুরে এসে আমার কাছে এই ঘরাণা শিক্ষা করেন। কলকাতা, মধ্যমগ্রাম, হাওড়া, ঝাড়গ্রাম, বর্ধমান, আরামবাগ এসব জায়গা থেকে বছরের পর বছর ছাত্রছাত্রীরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখবেন বলেই তো উৎসাহ নিয়ে আসছেন!

এই তো বিষ্ণুপুরে ধ্রুপদের ওয়র্কশপ হলো। সেই ধ্রুপদের ওয়র্কশপে দুশো জন অংশগ্রহণ করেছিলেন। গত বছর যদুভট্ট মঞ্চে ধ্রুপদের ওয়র্কশপ করতে ভূপাল থেকে এসেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত গুন্ডিচা ব্রাদার্স – রমাকান্ত গুন্ডিচা ও উমাকান্ত গুন্ডিচা।

এবছর ধ্রুপদ উৎসব করলাম। দুদিনের। কলকাতা, ভূপাল বিভিন্ন জায়গা থেকে শিল্পীরা এসেছিলেন। মানুষের উৎসাহ আছে বলেই না এগুলো সম্ভব হচ্ছে!

প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে, ‘সুরযজ্ঞ’ – শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের, চব্বিশ ঘন্টা ব্যাপী, নিরবিচ্ছিন্ন, অনুষ্ঠান। ২০১৯ শে ‘সুরযজ্ঞে’র ত্রিশ বছর পূর্ণ হবে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তো আর সবার জন্য নয়! সেখানে যে এতো মানুষ উৎসাহ দেখাচ্ছেন, বিষ্ণুপুর ঘরাণা যত্ন করে শিখছেন, সেটাই আশার কথা।

 

শ.চ.: বিষ্ণুপুর ঘরাণা, বিষ্ণুপুর শহরের বাইরে কি কোথাও শেখানো হয়?

প.সু.গ.: নিশ্চয়অনেকেই আছেন। আমার গুরু বিষ্ণুপুর ঘরাণার বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পী, পন্ডিত অমিয় রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় – কলকাতায় এ ঘরাণা শেখান। কলকাতায় আরো শেখান পন্ডিত নীহাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে ভারতবিখ্যাত শিল্পী মনিলাল নাগ শেখান, সেতার।