21 Jul 2018 - 17:00 to 19:30
Kolkata , West Bengal
Have you heard about the famous Boipara near College Street?
22 Jul 2018 - 07:00 to 09:00
Gwalior , Madhya Pradesh
The ancient capital of Gwalior is steeped in the splendour of
22 Jul 2018 - 07:00 to 09:00
Orchha , Madhya Pradesh
Orchha, meaning ‘a hidden place’, is a town brimming with

Workspace

বাঙালি মুসলিম মেয়েদের বিয়ের গানঃ একটি খোঁজ/Wedding Songs of Bengali Muslim Women

 

গানগুলো মেয়েদের। মেয়েরাই এর গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পী। সাধারণ গেরস্ত পরিবারের গৃহবধূ বংশ পরম্পরায় মা-দাদি-চাচি-খালাদের কাছে শুনে এসেছে এই গান। নিজেদের মত করে সুর বা শব্দ বদলে বদলে নিয়ে পরিবার বা আত্মীয় স্বজনের বিয়েতে আসর জমিয়েছে একান্ত অন্তরালেই। গানের মধ্যে দিয়েই আশা-আনন্দের কথা বলেছে, বলেছে আবেগ-অনুভূতির কথা, সমাজ-সংসারে অত্যাচার-বঞ্চনা, বাল্যবিবাহ-পণপ্রথার নানান দিক উঠে এসেছে, আবার রঙ্গ-ব্যঙ্গের আড়ালে করেছে প্রতিবাদ। গানের আঙ্গিক বিনোদনের; অথচ গানের বিষয় ও পরিবেশনায় উঠে এসেছে সামাজিক-রাজনৈতিক সচেতনতা। গোষ্ঠী-পরিবারের গন্ডীর মধ্যে একটা সামাজিক অনুষ্ঠানের পরিসরে যুগ যুগ ধরে এভাবে ফুটে উঠেছে সমাজের খন্ডচিত্র—শুধু বিয়ে আর পরবর্তী সংসারজীবন নয়, লোকসমাজের প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যাবে বাঙালি মুসলমান সমাজের মেয়েদের বিয়ের গানে।

 

সূত্রপাত

 

কথায় বলে গাছে কাঁঠাল আর গোঁফে তেল। মুসলিম বিয়ের গান নিয়ে আমার কাজ করার প্রাথমিক উদ্যোগটাও খানিকটা সেরকম। না ছিল পুঁথিগত গবেষণার পুঁজি, আর না ছিল এই গান শোনার অভিজ্ঞতা। কিন্তু অন্তঃপুরের আড়ালে থাকা সাধারণ মুসলিম পরিবারের গৃহবধূর আশা-হতাশা, ব্যাথা-বেদনার কথা, তাদের চোখে দেখা তাদের সমাজ, তাদের ভাষায় বাঁধা গানের ছত্রে ফুটে ওঠা না বলা কথায় কান পাতার ইচ্ছেটা ছিল অদম্য। এর মধ্যেই হাতে এল ’৯৬এ প্রকাশিত অধ্যাপক-গবেষক শক্তিনাথ ঝা এর ‘মুসলমান সমাজের বিয়ের গীত’ বইটি। আর সেই থেকেই শুরু হল এই অনুসন্ধান- একটি ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে আচার-অনুষ্ঠান ভিত্তিক ধর্মীয়-সামাজিক ‘বিবাহ’ উৎসবের সময়ে প্রচলিত এক লৌকিক ঐতিহ্যের খোঁজ।

 

পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোর মধ্যে বর্ধমান, বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদের বাঙালি মুসলমান পরিবারে সবচেয়ে বেশি প্রচলন রয়েছে এই বিয়ের গানের। শিল্পীদের আস্থা আর আন্তরিকতা ছাড়া এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টুকরোগুলো সংগ্রহ করা একরকম অসম্ভব বলেই মনে হল। শহর থেকে শহরতলি এবং সেখান থেকে ক্রমশ গ্রাম-গঞ্জ-মফস্বলের অন্তরালে লুকিয়ে পড়া এই প্রাচীন লোকঐতিহ্যকে একেবারে কাছে থেকে দেখতে না পেলে হয়ত এর মূল সুরটাই বেপাত্তা হয়ে যাবে। যোগাযোগ করলাম অধ্যাপক ও গবেষক শক্তিনাথ ঝা এর সঙ্গে। একবাক্যে বললেন এই চর্চার গভীরে যেতে হলে পা রাখতে হবে বাঙালি মুসলিম পরিবারের অন্দরমহলেই। তাঁদের বিশ্বাস এবং সাহায্য না পেলে শুধুমাত্র খ্যাতি-পরিচিতির উপরিতলে ভেসে থাকা বাণিজ্যিক সংস্কৃতির অংশটুকুই ছুঁতে পারা সম্ভব। তিনিই বললেন বর্ধমানের মনোয়ারা বেগম এবং ডক্টর সহিনুর খাতুনের কথা, যাঁরা আমায় নিয়ে যেতে পারেন ঐতিহ্যের অন্তঃপুরে। দুজনেই পারিবারিক সূত্রে নিজেরা বিয়ের গান করেন এবং পাশাপাশি আঞ্চলিক লোকধারা হিসাবে মুসলমান বিয়ের গান নিয়ে তাঁদের গবেষণা ও সংগ্রহও রয়েছে। দুজনেরই বই প্রকাশ হয়েছে যথাক্রমে ২০০২ এবং ২০০৪ সালে। কিন্তু কলকাতার বই-বাজারে সে বই চাপা পড়ে আছে বিস্মৃতির অতলে। অতএব বর্ধমান যাত্রা। তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তর থেকে পুরোনো ফাইল খুঁজে জোগাড় হল সহিনুর খাতুনের ফোন নম্বর। আগে থেকে সময় নিয়ে একদিন দেখা করতে গেলাম।

 

সাক্ষাৎ ও সমীক্ষা

 

সহিনুর খাতুন নিজে গান করেন এবং গবেষণাসূত্রে বহু প্রাচীন গান সংগ্রহ করেছেন। পারিবারিক পরম্পরায় একের পর এক প্রজন্ম ধরে এই বিয়ের গান হয়ে এসেছে তাঁদের পরিবারে। কিভাবে বাঁধা হত এই গান? সহিনুর বললেন, “বাড়ির মেয়েরা সবাই অবসর সময়ে বসে কথায় কথায় গান বাঁধতেন। কোনো প্রবাদ কোনো প্রচলিত কথা নিয়ে আলাপ শুরু হত তারপর মেয়েরা নিজের কবিত্বশক্তি দিয়েই একেকজন একেক কলি যোগ করে দিতেন মুখে মুখেই। এই নিয়ে একেকটা গান তৈরি হত। আর আত্মীয় স্বজনের বিয়েতে সেই গানই গাইত সবাই মিলে।” গানগুলো বিয়ের গান হলেও, বিয়ের বিষয় অতিক্রম করে মেয়েদের দৈনন্দিন জীবন এবং সমসাময়িক সমাজের ঘটনা পরম্পরা উঠে এসেছে এই গানগুলোয়। সেই দিক থেকে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। তবে, সহিনুর স্পষ্টতই বলেছেন, তার গবেষণা ও সমীক্ষার সময়ে তিনি লক্ষ্য করেছেন ’৯৫ সালের পর থেকে এই গান নতুন করে বাঁধার চল কমে এসেছে। পুরোনো গানই ঘুরেফিরে গাওয়া হয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠানে। তারপর গান গাওয়ার চলই হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সহিনুরের মতে, একদিকে যেমন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিনোদনের অভাব নেই, আবার অন্যদিকে শিক্ষা এবং সামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে এই প্রাচীন গানের ঐতিহ্য তার মর্যাদা হারাচ্ছে, রুচিবান শহুরে পরিবারে আধুনিকতার চাকচিক্যের সামনে মান্যতা হারিয়ে ফেলেছে মুখে মুখে গাওয়া এই গানের আড়ম্বরহীন সহজ অভিব্যক্তি। সহিনুর বললেন, “আগে মনে করা হত যে এই গান জানা খুব সম্মানের, যে জানে সে সংস্কৃতিবান; আর এখন এই গান গাওয়াকে ‘আনকালচারড’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।” নিয়ম ও আচার কেন্দ্রিক গানগুলি আনুষ্ঠানিক প্রয়োজনের তাগিদে কিছু কিছু গাওয়া হলেও বিচিত্র বিষয় ও কথায় বিয়ের গানের সমৃদ্ধ সম্ভার আজ প্রায় চর্চারহিত।

 

কেমন ছিল এই গানের আসর? বিবাহ নামক ধর্ম-আচার ভিত্তিক সামাজিক অনুষ্ঠানে কি ছিল এর অবস্থান? এখনও বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায় যেখানে এই গানের পরম্পরা বেঁচে আছে সেই রূপরেখাটাই বা কিরকম? এইসব প্রশ্ন নিয়েই হাজির হলাম মনোয়ারা বেগমের বাড়িতে আর সেখানেই মুসলিম সমাজে মেয়েদের লেখা আর গাওয়া বিয়ের গানের অন্দরমহল অপেক্ষা করে ছিল।

 

মনোয়ারা বেগম পারিবারিক সূত্রে বর্ধমান জেলার। বিয়ের গানের এক দীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে তার পরিবারে। তিনি, তার দিদি জাহানারা এবং দিদির মেয়ে নাজমুল নাহার বেগম তিনজনেই এখনো প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের বিয়ের অনুষ্ঠানে গান করেন সকলকে নিয়ে। এই রেওয়াজ তারা দেখেছেন তাদের পূর্ববর্তী আরো তিনটি প্রজন্মের কাছে, তবে সে ঐতিহ্য ছিল আরো সমৃদ্ধ, আরো ব্যাপ্ত। তাদের স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার মিশেলে আমাদের কথোপকথনে মুসলিম মেয়েদের বিয়ের গানের স্বরূপ ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকে।

 

গানের আসর

 

বর্তমান সময়ের দুই বা তিন প্রজন্ম আগে বাঙালি মুসলমান পরিবারে বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রায় মাসখানেক আগে থেকে এই গানের আসর শুরু হয়ে যেত। আর চলত বিয়ের দিন পর্যন্ত, বা কনেবিদায়ের সময় পর্যন্ত। বর বা কনেকে নিয়ে একদিকে চলত নানা আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-রশম আর তার সাথে সাথে মেয়েরা বিয়ের গান গাইত। এই পরিসর চিরদিনই একান্ত মেয়েদের। আর তাই গানে গানে ভাষা পেয়েছে তাদেরই আত্মকথন। গানের আসরে পরিবারের বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন প্রজন্মের মেয়েরা যোগ দেয়। ঢোল, ঘুঙুর, খোল ইত্যাদি বাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে খালি গলায় গান চলত দিন-রাত ভর। শুধু গান নয়, তার সঙ্গে ছিল নাচ এবং কাপ। গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবারের মেয়েরাই নাচ করত। আর কাপ বা রঙ্গকৌতুক এই বিয়ের গানের আরেক ঐতিহ্য। দুজন বা তার বেশি মহিলা একেক চরিত্রে অভিনয় করে কৌতুকের ছলে নেচে নেচে গান গাইত বা চাপান-উতোরের মধ্যে দিয়ে সুরে বাঁধা কথোপকথন চলত। বেশিরভাগ সময়েই এই কাপের মধ্যে দিয়ে উঠে আসত সংসারে ও সমাজে মেয়েদের প্রতি নানান অত্যাচারের কথা। গানের আসরে কোনো আগল নেই, তাই নির্দ্বিধায় মেয়েরা সুর-ছন্দের আড়ালে জানিয়ে দিত গোপন ক্ষোভ আর ব্যাথার কথা। কখনো স্বামী-শাশুড়ির অত্যাচার, কখনো প্রোষিতভর্তৃকার একাকীত্ব, কখনো বা বাপের বাড়ির আত্মীয় স্বজনের বিরহ বেদনা উঠে এসেছে গানের কথায়। কাপের সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই আদিরসাত্মক চটুল কৌতুক-পরিহাস চলত মেয়েদের মধ্যে। কিন্তু সেসব রাতের গভীরে, যখন বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা, বা পুরুষরা আশেপাশে কোথাও নেই, সেরকম সময়ে নিজেদের মধ্যে নানান মশকরা চলত এই গানে গানেই। বিয়ের গানগুলো তাদের কাছে শুধু ব্যক্তিগত নয়, এগুলো হল তাদের একান্ত আশা-আকাঙ্খার নিজস্ব পরিসর। এখানে সমাজ বা পুরুষের কোনোরকম বিধিনিষেধের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এই চর্চার পরিসরে মেয়েরা স্বাধীন এবং অবাধ।

 

মনোয়ারা বেগমের কথায় ৬০ এর দশক পর্যন্তও এই একমাসব্যাপী বিয়ের গানের আসরে একরকম পালা-র চল ছিল। নাচ-গান-বাজনা-কাপ-অভিনয় মিলিয়ে বিষয়ভিত্তিক পালা। একেক পালাগানের একেক রকম নাম ও বিষয়। আশেপাশের পাড়া বা গ্রাম থেকে দল বেঁধে মেয়েরা আসত এইসব পালা দেখতে এবং তাতে যোগ দিতে। বিয়ের এক মাস আগে থেকে একদিকে বারমহলে চলত ছেলেদের লেটো, আলকাপ প্রভৃতি আর অন্যদিকে অন্দরে জমে উঠত মেয়েদের পালাগান। শুধুমাত্র গান নয়, তার সাথে অভিনয় এবং বিষয়ভিত্তিক আবহ তৈরি করে মেয়েরা নিজেরাই বিনোদনের এক নিজস্ব পরিসর তৈরি করেছিল। অন্তঃপুরের ঘেরাটোপে বন্দী এইসব মেয়েদের অভিনয়দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিচার করার কেউ ছিল না, তাদের খ্যাতি-স্বীকৃতি-র কোনো আকাঙ্খাও ছিল না। মেয়েদের নিজেদের জন্যই নিজের খেয়ালে তৈরি করা লোকচর্চার এই সমৃদ্ধ পরিসর। এখানে না ছিল ধর্মের গোঁড়ামি, আর না ছিল সমাজের রক্তচক্ষু। বাঙালি সংস্কৃতির পরিধিতে নিজস্ব ভাষা আর কল্পনাশক্তি দিয়ে বাংলার মুসলিম মেয়েরা তাদের এই গানের আসরকে স্বতন্ত্র একটি লোকশিল্পধারা হিসাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিল।

 

মুসলিম বিবাহ ও বিয়ের গান

 

মুসলিম মেয়েদের বিয়ের গান মূলত বিবাহ নামক ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত বলেই বিয়ের গানের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠানের একটা পারম্পর্যগত যোগাযোগ রয়েছে। আর তার সাথে মিলিয়ে এই গানের স্বরূপ দেখতে হলে বাঙালি মুসলমান বিবাহের আচার-অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গও এসে পড়বে। একটা সময়ে দীর্ঘ এক মাস ধরে এই বিয়ের প্রস্তুতি ও তার সাথে বিয়ের গান চললেও ক্রমশ দৈনন্দিন ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সময়ের ব্যাপ্তি কমে এসেছে। তবু দীর্ঘদিনের পরম্পরা মেনে, বিয়ের মূল আচার-অনুষ্ঠানের দিন এবং বিয়ের আগের দু-দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় এখনো এই গানের চল আছে। পরপর বিয়ের আচারকে কেন্দ্র করে গানগুলি বাঁধা হয়েছে এবং সেভাবেই আজও এই গান গাওয়া হয়। আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে গানের সূত্র মিলিয়ে দেখলে তার পারম্পর্য কিছুটা এরকম-

 

বন্দনা গানঃ গানের আসর শুরু হয় বন্দনা গান দিয়ে। ভারতীয় শিল্পকলার অন্যান্য বিভিন্ন ধারার মতই, বিয়ের গানেও ধর্মীয়, সামাজিক এবং পারিবারিক পরিসরে পূজনীয়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে বিয়ের আচার শুরু হয়। বিয়ের গানে তাই প্রথমেই আসে বন্দনা গানের পালা। আল্লা-নবী-পীর, পরিবার-পরিজন, এবং সবশেষে গ্রামের সকলের চরণে সালাম জানানো হয় গানের মধ্যে দিয়ে। এইভাবে একদিকে বিয়ের আচার আর অন্যদিকে গানের আসর শুরু হয়।

 

ক্ষীর খিলানি গানঃ বাঙালি মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে, বিয়ের আগে বর বা কনেকে ক্ষীর খাওয়ানোর অনুষ্ঠান দিয়ে নিজ নিজ পরিবারে বিবাহ-পূর্ব আচারের পরম্পরা শুরু হয়। বিয়ের একদিন আগের রাতে পাত্র/পাত্রীকে পরিবার-পরিজন এবং পাড়া প্রতিবেশী ক্ষীর, পিঠা, পায়েস, মিষ্টি ইত্যাদি খাওয়ায়। এই ‘ক্ষীর খিলানি’ আচার চলার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে বিয়ের গান। গানের মধ্যে দিয়ে পাত্র/পাত্রীকে ক্ষীর খাওয়ানোর কথা, সেই ক্ষীর কিভাবে তৈরি হয়েছে তার বর্ণনা, ক্ষীর খাওয়ার সময় পাত্র/পাত্রীর বা পরিবারের লোকজনের ভূমিকা, তাদের মনের অবস্থা এইসমস্ত কথাই গানে উঠে আসে।

 

ঢেঁকি মঙ্গলার গানঃ বিয়ের আগের দিন বর-/কনের কৌমার্য্যের শেষ দিন হিসাবে আইবুড়ো ভাত বা থুবড়া ভাত খাওয়ানো আর তার সঙ্গে সঙ্গে নানান আচার অনুষ্ঠান প্রচলিত। থুবড়া ভাতের প্রধান পদ ‘পাকান’ বা এক ধরনের চালের পদ তৈরির জন্য ঢেঁকিতে চাল কোটা দিয়ে এদিনের আচার শুরু হয়। আর এই ঢেঁকি ও চাল কোটার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে মঙ্গল গীতি।

 

আলমতলার গানঃ বিয়ের মন্ডপ বা আলমতলা তৈরি করে ছেলেরা। কিন্তু সেই আলমতলার আচার অনুষ্ঠান শুরু হয় মেয়েদের গান দিয়ে। আলমতলার এসব গানের মধ্যে দিয়ে বিয়ের সময় ক্রমশ এগিয়ে আসার এবং ভবিষ্যৎ জীবনের নানান সম্ভাবনার কথা গানে বলা হয়।

 

ঝুমুর ডালার গানঃ একে একে বিয়ের আগের দিনের যাবতীয় আচার শুরু হয় এবং বিয়েগাউনিরা আচারের সঙ্গে সঙ্গে গান গাইতে থাকে। এই ঝুমুর ডালা অনুষ্ঠানের মধ্যেই একেকটি আচারের সঙ্গে একেকরকম গানের প্রচলন। এই সময়েই যথাক্রমে সরষে চালা, শিরতেল, হলুদ মাখা, সোহাগ মানানো, পানি খিলানো ইত্যাদি অনুষ্ঠানগুলি হয়। আচারের ধরন, আচারে ব্যবহৃত উপাদান বা সেই বিশেষ আচারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এই ঝুমুর ডালার গান। সেখানে যেমন সরষে চালা-র সময়ে ব্যবহৃত নানান কৃষিজ উপকরণের প্রতিটি ধরে ধরে গান রয়েছে, তেমনই রয়েছে সোহাগ মানানোর সময় আত্মীয়াদের দোয়া-আশীর্বাদ মূলক নানান গান।

 

ঝুমুর খেলাঃ তেল-হলুদ মেখে বিভিন্ন আচারের পর্ব শেষ হলে বাড়ির মেয়েরা বর বা কনেকে ঘিরে নেচে নেচে নানান ঠাট্টা-কৌতুক করে গান গায়। গানের প্রসঙ্গে চলে আসে পাড়া প্রতিবেশী বা পরিবারের লোকেদের স্বভাব-চরিত্র, কথাবার্তার ধরন নিয়ে নানান রং-ব্যঙ্গ।

 

কামান করার গানঃ বিয়ের আচার আর গানের পরিসর একান্তই মেয়েদের। কিন্তু সেখানে পুরুষ প্রবেশ ঘটে যখন পাত্র/পাত্রীর কামান করতে আসে পাড়ার নাপিত। মেয়েরা নাপিতকে বিদ্রূপ করে নানারকম গান করে আবার নাপিতও প্রত্যুত্তরে ছড়া কেটে তাতে যোগ দেয়। মেয়েদের বিয়ের গান বাঁধা ও গাওয়ায় নাপিতের প্রভাব কোথাও কোথাও লক্ষ্য করা যায়।

 

মঙ্গলস্নান বা কলস ভরার গানঃ এরপর জল এনে বর/কনেকে স্নান করানোর সময় আসে। এক্ষেত্রে বাড়ির মেয়েরা কখনো নিজেরাই আবার কখনো বর বা কনেকে সঙ্গে নিয়েই কাছের পুকুরে বা নদীতে জল আনতে যায়। সেই জল আনতে যাওয়া ও জল ভরার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানারকম গান। সকলে সেই গান গাইতে গাইতে কলসী নিয়ে জল আনতে যায়।

 

মেহেদি পরার গানঃ কনেকে মেহেদি পরিয়ে সাজিয়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গেও বিভিন্ন গান গায় বিয়েগাউনিরা।

 

থুবড়া ভাতের রাতের গানঃ থুবড়া ভাতের রাতে বর/কনের সমস্ত পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় পরিজন উপস্থিত হয় ‘থুবড়া থাল’ থেকে পাত্র/পাত্রীকে খাওয়ানোর জন্য। বিয়ের আগের রাত এবং প্রচুর লোক সমাগম মিলিয়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হয় বলে এই রাতে বিয়ের গানের আসরও বিচিত্রানুষ্ঠানের আকার নেয়। থুবড়া থালের আয়োজনের একপাশে মঞ্চ তৈরি করে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে মেয়েরা বসে পড়ে গানের আসরে। একেবারে বন্দনা গান থেকে শুরু করে সমস্ত আচার কেন্দ্রিক গানগুলি আবার করে গাওয়া হয়, এছাড়া এই রাতেই নানারকম নাচ, কাপ, পালায় অংশ নেয় মেয়েরা। গভীর রাত পর্যন্ত এই অনুষ্ঠান চলতে থাকে। বিয়ের যাবতীয় আচারের শুরু থেকে একেবারে কন্যাবিদায় পর্যন্ত নানান বিষয় উঠে আসে এই রাতের গানের আসরে।

 

গানের বিষয় ও চলন

 

মুসলিম বিয়ের গানের বিষয় শুধুমাত্র বিয়ের আচার ও মূল বিবাহ অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়। বৃহত্তর পরিসরে এর যাতায়াত। এমনকি, বিয়ের আচার কেন্দ্রিক গানের মধ্যেও আচার সংক্রান্ত নানান প্রসঙ্গের পাশাপাশি উঠে আসে বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা-র মত সামাজিক প্রথার ইঙ্গিত। ক্ষীর খিলানির গানে ছোট মেয়েটি ক্ষীর খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়ছে, বা তেল-হলুদ মেখে খেলছে ছোট্ট কনে, অথবা শ্বশুরবাড়ির বহুদূর পথ সহজেই ফুরিয়ে যাবে বাবা-চাচা-নানা-র যৌতুক দেওয়া দিঘী পেরোতে না পেরোতেই, এরকম নানা দৃশ্যকল্পের মধ্যে দিয়ে সমসময়ের সমাজের চিত্র গানের মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছে শিল্পীরা। একটি মেয়ের জীবনে বাধা-নিষেধের ঘেরাটোপ এবং সেই বাধা পেরিয়ে তার কামনা-বাসনা, ব্যাথা-বেদনার কথা, তার স্বপ্ন তার ইচ্ছের কথা যেমন এসেছে গানে, তেমনই পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজে ঘটে চলা ঘটনা আর অন্তঃপুরে মেয়েদের মধ্যে সেসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া এই বিয়ের গানে ধরা আছে। বিয়ের গানে প্রেমের কথা, স্বামীর দূরে থাকা নিয়ে মনোবেদনার কথা নানাভাবে এসেছে। সরাসরি প্রকাশ না করলেও স্বামীসঙ্গ পাবার ইচ্ছে গানের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছে মেয়েরা। আবার, কন্যাসন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের অবহেলা এবং বিরাগ নিয়ে মনের দুঃখের কথা বলেছে গানের রচয়িত্রী। একইসঙ্গে কোনো কোনো গানে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার নজির। রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নকশাল আন্দোলন, ইন্দিরা গান্ধীর বিজয়ের মত নানান প্রসঙ্গ। শুধুমাত্র ঘটনাই নয়, সেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ঘটনার প্রভাব সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে কিভাবে পড়েছিল তার ইঙ্গিতও পাওয়া যায় এইসব গানে। এদিক থেকে সমাজ-ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে এই বিয়ের গানগুলি।

 

বিয়ের গানের সুর, তাল, চলন বিভিন্ন অঞ্চলভেদে আলাদা হয়ে গেছে। কোনো গান হয়ত বহুদিন ধরে কোনো পরিবারে চলে আসছে, এখন সেই পরিবারের একটি মেয়ে বিয়ের পর অন্য কোনো গ্রামে, অন্য জেলায় গিয়ে সেখানকার প্রচলিত গানের সুরে তার জানা পুরোনো গানের কথাগুলো বসিয়ে নিয়েছে। মুখে মুখে গাওয়া আর মুখে মুখেই তৎক্ষণাৎ বেঁধে ফেলা এই গানগুলো তাই মৌখিক ঐতিহ্যের রীতি মেনে সুরে-ছন্দে-কথায় বদলে গেছে মুখে মুখেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে গানের শব্দ, সময়োপযোগী শব্দ বসিয়ে নিয়ে সেই অনুযায়ী গানের তাল আর সুরকে মানিয়ে নিয়েছে বিয়েগাউনিরা। গানের মধ্যে বৈচিত্র্য এসেছে এভাবেই। কোনো কোনো গানে ব্যবহার হয়েছে সাধারণ প্রচলিত লোকবাদ্য, মেয়েদের ব্যবহার উপযোগী ছোট ঢোল, ঘুঙুর ইত্যাদি। আবার কোথাও আচারের রীতি মেনে বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই গান চলেছে বিয়ের আসরে।

 

বিয়েগাউনি

 

প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা যেকোনো লোকধারার পরিসরেই প্রাথমিকভাবে শিল্প আর যাপনের ভেদ না থাকলেও, ক্রমশ চর্চা আর প্রতিভার সাপেক্ষে দক্ষতার ভেদ ঘটে এবং সেই অনুযায়ী আলাদা করে বিশেষ বিশেষ শিল্পীসত্তা তৈরি হয়। রোজকার জীবনে সেই চর্চা জড়িত থাকলেও সৃজনশীলতা আর পরিবেশনার গুণে কেউ কেউ বিশেষ সমাদর পান। বিয়ের গানও এর ব্যতিক্রম নয়। সাধারণ বাঙালি মুসলিম পরিবারের মেয়েরা এই গান গাইলেও তাঁদের মধ্যেই কেউ কেউ গীতালি শিল্পী হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। বিয়ের আচারের পরিসরেও তাই এই সহজ নিয়মকে স্বীকৃতি দিয়ে গীতালি দলের ‘হাঁড়িমানা দাওয়াত’ আচারের অঙ্গ হয়ে ওঠে। বিয়ের কাজেও অংশ নেবেন এরা, আবার তার পাশাপাশি গানও গাইবেন। বিয়েবাড়িতেই তাঁদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হবে। বিয়ের আগেও বিশেষ বিশেষ দিনে যেমন পাকা দেখা, পান-চিনি, লগন ধরা, গায়ে হলুদ ইত্যাদির সময়ে আশেপাশে যারা খুব ভাল গান করেন তাদের আলাদা করে নিমন্ত্রণ করার চল আছে। বর্ধমান জেলায় এদের বলা হয়েছে ‘গীতগাহুনি’ বা ‘গীতগাউনি’, বীরভূম, মালদা, মুর্শিদাবাদে এরা ‘গীত গাহিরি’ বলে পরিচিত আর উত্তরবঙ্গে এদের বলা হয় ‘গীতালি’ বা ‘গিদালি’। এরা কেউই পেশাদার নন, অন্দরমহলের সাধারণ গৃহবধূই। পাড়া-প্রতিবেশী বা গ্রামের মধ্যেই হয়ত বাকিদের থেকে গান ভাল করেন বা মুখে মুখে তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি অনুযায়ী গান বাঁধতে পারেন বলেই এদের কদর আলাদা। এই বিয়েগাউনিরা বিয়ের দিনের আগে থেকেই বিয়েবাড়িতে উপস্থিত হয়ে আসর মাতিয়ে রাখেন আর সঙ্গে যোগ দেন বিয়ের স্ত্রী আচারেও।

 

বিয়ের গানের চর্চাক্ষেত্র

 

মুসলিম বিয়ের গানের চর্চা অন্দরমহলের পরিসরেই প্রসার পেয়েছে। পরম্পরাগতভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এই গানের চর্চা অব্যাহত রয়েছে। নিজেদের পরিবার, আত্মীয় বা পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যেই শিল্পীরা গান গাইতে উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু অন্তঃপুরের গন্ডীর বাইরে লোকধারা হিসাবে এই বিয়ের গানের আরেকটি শাখা প্রসার পেয়েছে বহির্বিশ্বেও। ১৯৫০ এর দশক পর্যন্ত বর্ধিষ্ণু মুসলিম পরিবারের বিয়েতে রায়বেঁশে, আলকাপ প্রভৃতি পুরুষপ্রধান লোকশিল্পের পেশাদারদের পাশাপাশি মহিলা শিল্পীদের ‘মেরাসিন’ দলকেও আনা হত। এই মেরাসিনরাও বিয়ের গানই করেন। বিয়ের আচার-রীতি প্রসঙ্গ এবং তার পাশাপাশি প্রেম, ভালোবাসা ও অন্যান্য নানান প্রসঙ্গ নিয়েই তাদের গান। একই ধারার গান গাইলেও তাদের সঙ্গে অন্দরমহলের বিয়েগাউনিদের একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই মেরাসিনরা পেশাদার শিল্পী এবং গ্রাম-পরিবারের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর দর্শক পরিসরে এরা গান করেন। পারিবারিক বিবাহ অনুষ্ঠান এবং বিনোদনের বারোয়ারি মঞ্চ দু-জায়গাতেই এদের যাতায়াত এবং বিয়ের গানের মাধ্যমেই এরা জীবিকা নির্বাহ করেন। পারিবারিক অনুষ্ঠানে এদের নিয়ে আসার জন্য একইভাবে নিমন্ত্রণকর্তাকে কিছু নজরানা বা মূল্য দিতে হয়। একইসঙ্গে বিয়ের আসরে উপস্থিত দর্শকদের থেকেও ‘ফেরি’ বা বখশিশ আদায় করেন এরা। বর্ধমান, বীরভূম, মালদা এবং মুর্শিদাবাদে একসময় মেরাসিন দল খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। অন্দরমহলের গীতালি শিল্পীদের গানের তুলনায় বিষয় বৈচিত্র্য ও পরিবেশনার দিক থেকে মেরাসিন দের গান অনেক বেশি চটুল, বিনোদন কেন্দ্রিক এবং আদিরসাত্মক প্রসঙ্গ পূর্ণ। দর্শকের বৃহত্তর গন্ডীতে চাহিদা ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে গানের বিষয় ও পরিবেশনায় এই গান ও তার চর্চার পণ্যায়ন হয়েছে। আর পণ্য হিসাবে উপভোগের সামগ্রী হয়ে উঠতে গিয়ে এই মেরাসিনদের গানে ভাষার চাকচিক্যও বেড়েছে, আর বিনোদনের উপাদানও রয়েছে ভরপুর। বাইরের জগতের ঘটনাবলী এবং সমাজের বিভিন্ন প্রসঙ্গ যা গীতালি শিল্পীদের কাছে অজানা, সেইসব গানে পারঙ্গম মেরাসিন দল। পরিবারের গন্ডীর মধ্যে থাকা সাধারণ মুসলিম গৃহবধূর জড়তা না থাকায় মেরাসিনদের গানে রঙ্গ-ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ বা কটাক্ষ, খোলামেলা আবেগ-অনুভূতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। তার পাশাপাশি বিয়ের আচারে নানান ত্রুটি-বিচ্যুতি বা যৌতুক, তত্ত্বের প্রসঙ্গে নানান কথা আসে মেরাসিনদের গানে। এই দলে শিল্পীরা মূলত মহিলা হলেও মেরাসিন দলে একজন পুরুষ থাকেন এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে গানের ডাক পেলে এরা একসাথে দল বেঁধে গান করতে যান। ৫০-এর দশকের পর থেকে বিয়ের আসরে মেরাসিন দের ডেকে আনা কিছুটা হলেও কমে গেছে।

 

এই সময়ে দাঁড়িয়ে, মুসলিম বিয়ের গানের চর্চার পরিসরের প্রসঙ্গে তাই একটা বিতর্ক উঠে আসে- এই চর্চা অন্দরের না মঞ্চের? ব্যক্তিগত না সার্বজনীন? আরো গুরুত্বপূর্ণ, এই সুপ্রাচীন লোকঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য কেমন হওয়া উচিত এর চর্চা ও তার পরিসর? কেননা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গানের প্রচলনের ধারা ব্যাহত হয়েছে ক্রমশ। নতুন প্রজন্মের কাছে বিনোদনের হাজার উপকরণ এই লোকধারার সাদামাটা আঙ্গিকের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়। তার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষা ও জীবিকা অর্জনের সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে বদলেছে অবসর ও মন্থর জীবনের ধরণ। নতুন করে গান বাঁধা বা গাওয়ার বদলে আচার-নীতি মেনে বিয়ের সময় সামান্য গান হওয়াটাই এখন রেওয়াজ। ফলে চর্চার অভাবে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে এই বিয়ের গানের ধারা। তার সঙ্গে সঙ্গেই, শিল্পগুণের সমারোহে বাইরের জগতের বৃহত্তর মঞ্চে কিছুটা হলেও এই গানের কদর বেড়েছে। আর বিশ্বের দর্শকের কাছে বিনোদনের উপাদান হিসাবে পরিবেশন করতে গিয়ে গানগুলো হারাচ্ছে তার স্বতঃস্ফূর্ত আঙ্গিক। অবরোধের আড়াল থেকে গেয়ে ওঠা ব্যাথার কথা, জীবন ও সমাজের সত্যিটা গানে গানে তুলে ধরার কথার চেয়ে চটুল ও উল্লাস-মুখর বিষয়ই প্রাধান্য পাচ্ছে ক্রমশ। বিবাহ অনুষ্ঠানের আচার-রশমের পরিসর, পরিবার-পরিজন-আত্মীয়ের আনন্দ ও আশীর্বাদের পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিল্পের মঞ্চে পণ্যায়নের শিকার হচ্ছে এই গান। লোকসংস্কৃতির এই পণ্যায়ন আমাদের অজানা নয়। যুগের প্রয়োজনে এবং বিনোদনের চাহিদায় এই শিল্প-পণ্য দ্বন্দ্ব চলবেই। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও উৎসাহে এই লোকধারার আকর বাঙালি মুসলিম মেয়েদের নিজস্ব পরিসর থেকে, লোকজীবন ও দৈনন্দিন যাপনের অন্তরাল থেকে এই বিয়ের গানের অন্দরমহলে এখনও পৌঁছনো যাবে। শোনা যাবে, গানের মধ্যে লেখা হয়ে আছে অবরোধবাসিনীর আত্মকথা।

 

Traditional Bengali Muslim wedding songs belong to women. They have been written, composed and rendered by women. A housewife in a typical household has inherited these songs from her mother, grandmother and aunts. Improvising on the tune or words of these songs, she has often stolen the show at the weddings in the immediate family or among relatives in an exclusively female space hidden from the male gaze. Through these songs, they have expressed their hopes and little pleasures, emotions and feelings, talked about social discrimination, oppressive customs like child marriage and dowry and voiced their protest behind tongue-in-cheek humour. While the structure and rendering of these songs are in the form of entertainment, their content and performance have expressed socio-political consciousness. Within the boundaries of family and community, and in the backdrop of a social ritual, fragmentary pictures of society have been chiseled over a long time: the wedding songs of Bengali Muslim women not only depict marriage and post-marital family life, but also represent the pulse of folkways and society.

 

The beginning

 

My primary attempt at working on Muslim wedding songs was, as the saying goes, like counting chickens before they are hatched. I had done no archival work, nor had any experience of listening to these songs. All I had was an overwhelming urge to overhear the hopes and despair, the pains and happiness of a typical Muslim housewife confined within the inner chambers of home; to see the society around her through her eyes; to eavesdrop on songs giving expression in her own words to unarticulated feelings. Meanwhile, I laid my hands on Musalman Samajer Biyer Geet, a book by Prof. Shaktinath Jha published in 1996. This was precisely the point at which began this enquiry—a search for a folk tradition performed in ritual-laden, socio-religious marriage ceremonies of a certain religious community.

 

In West Bengal, the wedding songs are most widely performed in Bengali Muslim families of Bardhaman, Birbhum and Murshidabad. It seemed impossible to me to collect the fragments of this time-honoured tradition scattered across places without winning over the trust and earnestness of the performers. If I am not able to see this century-old tradition gradually sliding off from city to suburbs and from suburbs to mofussil and countryside, at close quarters, the core tune might be lost to me. I established contact with Prof. Shaktinath Jha and his words echoed my feeling. One has to step in the inner-chamber of the Bengali Muslim families in order to go into the heart of this enquiry. Without winning over the trust and assistance of these families, all one would be able to do would be to scratch the surface of a commercialised culture inflated by fame and publicity. Prof. Jha told me about Manoara Begum and Dr. Sahinur Khatun from Bardhaman, who could take me to the inner courtyard of this tradition. Both these women perform wedding songs that they inherited as a family tradition and both of them have collected and researched on Muslim wedding songs as a local folk practice. The books by Manoara Begum and Sahinur Khatun were published in 2002 and 2004 respectively. But those have been lost under the piles of books in the grand book market of Kolkata. Hence a trip to Bardhaman seemed to be the only option. The contact number of Dr Khatun was found in an old file of the Ministry of Information and Culture, Government of West Bengal. Making an appointment, I went to meet her one day.

 

The interaction and the survey

 

Dr Sahinur Khatun sings these songs herself and has collected many old songs in the course of her research. In her family, these wedding songs have been handed down to later generations as a family tradition. How were these songs composed? According to Khatun, 'The women of the family often used to compose songs in their leisure time. The conversation would start with some common saying or some proverb and then women would use their poetic imagination to add words and lines to it. Each song used to be composed in this way. And then everybody would get together to sing those songs for the wedding of a relative.'

 

Although these are wedding songs, their themes have gone beyond marriage rituals to talk about the quotidian life of women and contemporary happenings in society. Seen from this perspective, these songs contain documentary and historical value of an immense importance. But, as Sahinur has unambiguously stated, during her study she noted that the practice of composing new songs had been on the wane since 1995. Older songs were being sung in the weddings, and then the very practice of singing wedding songs has been declining. According to Sahinur, on the one hand, there is no dearth of entertainment from the various mass media, and on the other hand, this old tradition is losing its dignity with the dissemination of education and in the changed social fabric. The simple and spontaneous expression of these songs is losing acceptance in the face of the glitz of urban modernity. Sahinur observed, 'Previously the knowledge of these songs used to be considered something respectable and a mark of culture, while these days singing these songs is being looked down upon as an 'uncultured' practice.' Although some songs are still being performed for the sake of ritual, the repertoire of wedding songs rich with varied themes and lyrics is an almost un-pursued domain today.   

 

What were the song performances like? What was its position in the religious ritual-laden social ceremony of a wedding? And what are the contours of survival of these songs in a handful of districts of present-day Bangladesh and West Bengal? I visited Manoara Begum’s place with these questions, and the inner-domain of the wedding songs composed and sung by the Muslim women was awaiting me precisely there.

 

Manoara Begum was born and raised in Bardhaman. The tradition of wedding songs is a long one in her family. She herself, her elder sister Jahanara and the latter’s daughter Najmul Nahar Begum still perform songs at the weddings of neighbours and relations. They have witnessed this tradition in the company of three previous generations, but that was a more extensive and rich tradition. In the course of our conversation, the memories and experiences of these women gruadually started revealing the nature of the wedding songs of Muslim women.

 

The performance

 

As recently as two or three generations before the present time, song performances used to begin almost a month before the wedding in a Bengali Muslim family and it used to continue till the day of the wedding or the farewell ceremony of the bride. Women of the community used to sing wedding songs on the sidelines of the rituals performed around the bride or the bridegroom. As this space has always been an exclusively female one, song after song has expressed women’s own narration. Women of the family, of various ages and belonging to various generations, used to join these performances. Songs used to be performed day and night to the accompaniment of instruments like dhol, khol, etc. Women of the family used to dance to the tunes of the songs.

 

Kaap or comic performances are another part of this tradition. Two or more women would play different characters in a comical vein with song-and-dance, or there would be charges and counter-charges thrown at each other in the form of songs. The kaap performances would often talk about the everyday oppression of women at home and in the world. As nothing was a taboo subject at a performance, women would unhesitatingly express their secret sorrows through songs. The songs would talk about the torture perpetrated by husbands and mothers-in-law, the loneliness of the wife left behind by the husband, or the longing felt by the wife for the relations at her parental home. Erotic humor was common in the kaap performances. But the time for it was late at night, when children or men of the family were not around; at such times erotic jokes would be exchanged among women through songs. Apart from being a private expression of women, the wedding songs were an autonomous domain of their hopes and desires, a forbidden territory for either the rest of society or for men. Women were free and unrestricted in this domain. 

 

According to Manoara Begum, a certain kind of theatrical performances used to be enacted in this month-long wedding affair till the 1960s. The performances had different subjects and names. Women from the neighborhood or neighbouring villages would come in large groups to watch and join these theatrical performances. All-male performances like Leto and Alkaap in the outer domain of the house and women’s theatrical performances in the inner domain would start a month before the actual wedding. Apart from songs, women would infuse acting and subject-based ambience into these performances to create their own space of entertainment. There was no one to judge the acting skills and creativity of these women confined to the inner domain of home, nor did they aspire for fame or recognition. It was a rich space of folk art created by the fancy of women and free from either religious obscurantism or social domination. By means of their language and imagination, the Muslim women of Bengal could make their song performances a distinct tradition of folk art in the sphere of Bengali culture.

 

Muslim weddings and wedding songs

 

As the wedding songs of Muslim women are associated with the social-religious ceremonies of a wedding, the sequence of songs relates to that of wedding rituals. Although at one time the preparations for marriage and with it the song performances would continue over a month, the time has diminished to a considerable extent as everyday life has become much busier. Yet, following the time-honoured tradition, the songs are being performed on the day of core marriage rituals and on the two days preceding it in some districts of West Bengal. These songs were composed in keeping with the sequence of wedding rituals and they are still being performed in the same order. The thread of songs associated with ceremonies refer to such a sequence:

 

Vandana songs: The performance begins with the vandana or prayers. Like various other foms and genres of Indian art, wedding songs also begin by paying respect to Allah, Muhammad the Prophet and Islamic saints, to the family and relations and finally, to everyone in the village. This is the manner in which both the wedding rituals and the song performance begin.

 

Kheer-Khilani songs: In the case of Bengali Muslim weddings, the sequence of pre-wedding rituals starts with the ceremony of making the bride/groom eat kheer or condensed and sweetened milk. On the penultimate night before the wedding the relations of the family and neighbors make the bride/groom eat condensed and sweetened milk and various sweets. The songs describe the ceremony, how the milk and sweets were prepared, the role of the relatives of the bride/groom during the ceremony, their mental state, etc. 

 

Dhenki-Mangala songs: As the day before the wedding is the last day of bachelorhood/spinsterhood for the bride/groom, a feast is being given for him/her and there are rituals associated with this feast. The sequence of rituals on this day begins with husking rice on the husking-pedal or dhenki to cook pakan or a preparation of rice, the main dish of the feast. Auspicious songs are performed along with the husking.

 

Alamtala songs: Alamtala or the wedding platform is prepared by men, but the ceremony of alamtala begins with women’s songs. Such songs talk about the approaching hour of marriage and the possibilities of the future i.e., post-marital life.

 

Jhumur Dala songs: As the ceremonies advance one by one on the day before marriage, the wedding singers continue the sequence of songs. There are different songs for each ritual in the jhumur dala ceremony. During this ceremony such rituals as sorshe chala (straining mustard seeds), shirtel (oiling hair), halud makha (the turmeric massage ceremony), sohag mana (praying for the bride), paani khilano (water offering) etc. are performed. The songs in this ceremony describe the nature of the ritual, ingredients used, and the purpose of the ritual. There are songs on every crop used during the sorshe chala ritual, and songs conveying the blessings of the elders during the sohag mana ritual.

 

Jhumur Khela songs: After the oil and turmeric associated rituals are finished, the women of the family dance and sing funny songs surrounding the bride/groom. The songs take digs at the character and manner of speaking of those in the family or of neighbours.

 

Kaaman Kora songs: Although the space of wedding rituals and songs is an exclusively female domain, a man enters with the arrival of the barber coming to groom the bride/groom. The women hurl jokes at the barber's expense in their songs and the barber joins in by throwing similar jokes back. The influence of the barber upon the composition and performance of wedding songs by women is notable.

 

Mangal-Snan or Kalas Bhara songs: Then comes the time of fetching the water in a pitcher and bathing the bride/groom. The women of the family, sometimes along with and sometimes without the bride/groom, go to the nearby pond or river. Various songs are associated with this ceremony of fetching the water and filling the pitcher. Women go to fetch water singing these songs.

 

Mehendi songs: The wedding singers sing different songs during the ceremony of adorning the bride with henna.

 

Songs on the night of Thubra Bhaat: On the night of the feast for the still unwed bride/groom all his/her relations and neighbours arrive to make the bride/groom eat from a special plate. As a mood of festivity prevails due to the gathering of so many people on this last night before the wedding, the song performance on this night too assumes the air of a soirée and continues till late at night. The performance on this night describes various subjects ranging from the beginning of the wedding rituals to the farewell of the bride.  

 

Themes and style of the songs

 

Muslim wedding songs are not confined to the wedding rituals and marriage ceremony; they relate to a broader domain. Even the songs centering round the wedding rituals hint at social customs like child marriage and dowry. The little girl has fallen asleep while drinking the condensed and sweetened milk in a kheer-khilani song, the little bride is playing with oil and turmeric smeared on her body, or the long journey to the husband’s home would end as soon as the bride crosses the lake given as a dowry—through such images the artists painted a realistic picture of their contemporary society. Just as the songs depict the taboos and restrictions in a woman’s life, and her desires and sorrows, her dreams and wishes to transcend those boundaries, similarly they refer to the events of the society at large and the reaction of women at home to those events. And the wedding songs have depicted, among other things, love and the wife’s anguish as the husband lives abroad. The longing for the husband’s company has been obliquely referred to in these songs. And the authoresses of the songs have expressed their anguish at the negligence of the parents towards a girl child. There are songs that refer to historic events like the Second World War, the Naxalbari Movement and the electoral victory of Indira Gandhi. Such songs not only refer to the events, but also indicate the kind of political-economic impact these had created upon people of different social classes. Seen from this perspective, these wedding songs are an important document of social history. 

 

The tune, rhythm and style vary from region to region. For instance, a song received by a young woman as an old family tradition, journeys with the woman to another village, maybe to another district, after her marriage and she sets the tune in currency there to the old words. Following the way of oral tradition, these songs composed and sung verbally have undergone changes in terms of tunes or lyrics. The wedding singers have replaced older words with those more suitable to the time and set the tune and rhythm accordingly. That is how variation was introduced in the songs. While some songs are sung to the accompaniment of common instruments like a small dhol, or other instruments suited for women, other songs are sung more conventionally and without any accompaniment.

 

The performers

 

Although there is little difference between art and life-lore in any folk tradition associated with the everyday, practice and genius gradually contribute to the difference in skills, and in keeping with that, individual artistic selves come into being. Although the practice is associated with the quotidian life, some receive more kudos than others due to their creativity and presentation. Wedding songs are no exception. Although women belonging to ordinary Bengali Muslim families sing these songs, some among them become known as wedding performers. Within the sphere of wedding rituals too the harimaana dawat or a three-day long invitation for food and stay to the performers’ group has become a part of the wedding ceremony. The performers participate in the wedding rituals and also perform songs. And the excellent singers in the neighborhood are invited on the eve of pre-wedding ceremonies such as paaka dyakha (final words between two families), paan-chini (exchanging tokens of this new bonding), lagan-dhora (engagement of the bride and bridegrrom), gaaye holud (receiving turmeric from the bridegroom’s family), etc.

 

The performers are known as geet gahuni or biye gauni in Bardhaman, as geet gahiri in Birbhum, Malda and Murshidabad, and as gitali or gidali in North Bengal. Far from being professional performers, these women are regular housewives belonging to the inner domain of the family. As they sing better than their neighbours or the others in the village and can improvise instant songs to match the situation, they receive special regard in the village. These wedding performers appear in the house before the wedding day and warm the gathering up with their performances, apart from participating in the women’s rituals.  

 

The performance space

 

The practice of Muslim wedding songs has received nourishment in the inner chambers of the family. The cultivation of these songs has continued from one generation to the other as family inheritance. And the performers have appeared to sing in their own families or the families of their relations and neighbors. But another stream of these wedding songs has expanded ouside the confines of the family, in the outer world, as a folk tradition. Till the 1950s, beside the male-dominated Alkaap or Raaybneshe folk groups, Merasin bands composed of female performers used to be hired on the eve of the wedding in well-off Muslim families for the performance called Musalmani Biyer Gaan. These merasins also perform wedding songs on wedding rituals and on love and other themes. Although both sing the songs of the same genre, the merasin performers are distinct from the gitali singers or wedding singers belonging to the inner domain. The former are professional performers and they sing outside the confines of family or village, in front of a broader audience. They are regular performers both in the family weddings and on the public stage and they earn their living from these performances. The head of the household has to pay some money in order to bring them to the wedding of his family. And they also take tips from the audience present at the wedding. At one time the merasin bands were immensely popular in Bardhaman, Birbhum, Malda and Murshidabad.

 

Compared to the songs of the gitali performers belonging to the family, the songs of the merasin are more captivating, entertaining and laden with erotic references. The language of their songs is much more pompous and entertainment-oriented. As the merasin performers are free from the inhibitions common to Muslim housewives, their songs are more frank in terms of humour, irony or the expression of different emotions. Apart from this, their songs refer to various drawbacks of the wedding rituals or customs like dowry. Although the performers in such groups are essentially women, the groups usually have one male performer, and they go together to perform upon receiving an invitation. The practice of inviting merasin performers to weddings witnessed a decline, even if to not so considerable an extent, after the 1950s.

 

Thus, in today’s time the obvious debate surrounding the Muslim wedding songs would be: Does the tradition belong to the family or the stage? Is it private or public? Or, even more importantly, what should be the space and mode of performance to make this century-old tradition live longer? With time the flow of this tradition from one generation to the other has been impeded. A thousand means of entertainment seem much more attractive to the younger generation than this simple tradition. Moreover, with the spread of education and rising consciousness about earning a living among women, the forms of leisure and lifestyle of women have undergone a transformation. Instead of composing or singing new songs, doing a little singing during the wedding for the sake of ritual has become the standard practice nowadays. Consequently, the tradition of wedding songs is gradually going into oblivion due to the lack of practice and cultivation.

 

On the other hand, these songs have received some appreciation in the outer world on their artistic merits. As a result, the songs are losing the spontaneity of their form as they are being performed essentially as a form of entertainment before the audience at large. Erotic and funny themes are gaining more importance than the expression of sorrows and social reality. Being alienated from the domain of wedding rituals and the familial happiness and blessings, the songs are falling prey to commodification on the public stage. This commodification of folk cultural practices is a fact not unfamiliar to us. This contradiction between art and commodity would follow the dynamics of social needs and of the demand for entertainment. But individual efforts can still make it possible to penetrate the inner chambers of wedding songs, which is an autonomous domain of the Bengali Muslim women and the quotidian life. It is still possible to listen to the self-narration of the constrained woman etched in the songs.